যমুনা প্রতিদিন
ঢাকাবুধবার , ৫ মে ২০২১
  1. English
  2. অর্থ ও বাণিজ্য
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. খেলাধুলা
  6. গণমাধ্যম
  7. চাকরি
  8. ছবিঘর
  9. জাতীয়
  10. জেলার খবর
  11. তথ্যপ্রযুক্তি
  12. দেশজুড়ে
  13. ধর্ম
  14. নারী ও শিশু
  15. প্রবাসের কথা

ওঁরাই মানবতার বন্ধু

আমানুল্লাহ আমান
মে ৫, ২০২১ ৬:৪৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

মো. আমানুল্লাহ আমান:

বলুন তো! আপনার জীবনের সবচেয়ে ভাল কাজ কোনটি এবং সেই কাজটি কবে করেছেন? আচ্ছা বলতে পারেন, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কাজ কোনগুলো? নিশ্চয় পিতামাতার সেবা, অসহায়দের অন্ন-বস্ত্রের ব্যবস্থা করে পাশে দাঁড়ানো, পথশিশুদের হাতে বইপুস্তক তুলে দিয়ে তাদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়ানো।

স্বেচ্ছাসেবীরা নিশ্চয় এগুলোই বলবেন। তবে এর বাইরে? রক্তদান। বলতে পারেন, মহৎ এ কাজটির পারিশ্রমিক কত? কোটি টাকার উর্ধ্বে! এক ব্যাগ রক্ত দেয়া মানুষের পারিশ্রমিক কোটি টাকা দিয়েও যথার্থ আদায় হবে না।

হাসপাতালে ভর্তি থাকা মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাচাঁতে রক্তদান করতে এগিয়ে আসা মানুষদের চেয়ে উদার মানসিকতার মানুষ পৃথিবীতে নেই বলেই আমি মনে করি। যেটি টাকা বা সম্পদ দিয়ে কেনা যায় না। মহৎ এ কাজের অংশীদার হওয়ার সৌভাগ্য হয় না সবার। আর সেটি যদি হয়, সিয়ামরত অবস্থায় রক্তদান!

নিশ্চয় সৃষ্টিকতার্র সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির জন্য এটি করোনাকালের অন্যতম সেরা কাজ। এ রক্তদান কর্মসূচির সাথে সম্পৃক্ত প্রতিটি ব্যক্তির কাছে পৃথিবীর মানুষ চিরঋণী। এটা ত্যাগেরও। একটা ফোন কল বা ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে অচেনা-অজানা একজন অসুস্থ মানুষের জন্য রক্ত দিতে চাওয়া নিশ্চয় শো-অফ নয়, ত্যাগই। আর রোজাদার রক্তদাতার তো কোনো তুলনাই হয় না।

যদিও রক্তদানের ফলে শরীরে কোনো সমস্যা তৈরি হয় না। সাধারণত একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের শরীরে পাঁচ-ছয় লিটার রক্ত থাকে। আর দান করলে কমে ২৫০ থেকে ৪০০ মিলিলিটার রক্ত। যা শরীরের মোট রক্তের ১০ ভাগের এক ভাগ। তবে রক্তের মূল উপাদান পানি ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পূরণ হয়ে যায়।

নিয়মতি রক্তদাতার লিভার ও হার্ট ভাল থাকার পাশাপাশি শরীরের লোহিত কণিকাগুলোর প্রাণবন্ততা বাড়িয়ে তোলে ও নতুন কণিকা তৈরির হার বাড়ায়। যা সুস্থ থাকার অন্যতম সহায়ক। শরীরে অতিরিক্ত আয়রনের ফলে সৃষ্ট হেমোক্রমটোসিস প্রতিরোধে এবং স্থুলোদেহীদের ওজন কমাতে রক্তদান বেশ কার্যকরী। আর মৃত্যু পথযাত্রী মানুষকে পৃথিবীতে আরো ক‘দিন বেঁচে থাকার সুযোগ করে দেয়ার মানসিক তৃপ্তি তো রয়েছেই। এটাই তো মানবতা।

এমনই দুই যুবক। মো. আলমাছ আলী ও মো. শাহরিয়ার সুলতান।একজন ছাত্রদের অভিভাবক, আরেকজন ছাত্র।

শাহরিয়ার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের মেধাবী শিক্ষার্থী। ইংরেজির ছাত্র হলেও প্রয়োজনের তাগিদে করোনাকালে চাকরি নিয়েছেন বেসরকারী একটি প্রতিষ্ঠানে। তাছাড়া এক বছর থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, তাই শুধু শুধু বসে না থেকে কিছু তো করাই যায়। ফলে শুরু করেছেন একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি, শো-রুমে অফিস করছেন সকাল ১০টা থেকে রাত ১০ অব্দি।

আর আলমাছ আলী দেশের নার্সিং পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করছেন দীর্ঘদিন যাবত। একটি কোচিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করে নার্সিংয়ে ভর্তিচ্ছুদের জন্য সব ধরণের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন তিঁনি।

তবে সরকারী নির্দেশনা থাকায় বন্ধ রেখেছেন কোচিং সেন্টার। অনলাইনে চালিয়ে যাচ্ছেন পাঠদান কার্যক্রম।

দুজনই মানবতার গর্ব। রক্তের প্রয়োজনীয়তার সংবাদ পেতেই সাড়া দিয়েছেন। বলেছেন, “রক্ত দেয়ার জন্য মনে মনে খুঁজছিলাম, বাট মানুষ পাচ্ছিলাম না।” ফলে ছুটে আসেন হাসপাতালে, নিঃসংকোচে দিলেন শরীরের রক্ত। তবে এবারই তাদের প্রথম রক্তদান নয়। আলমাছ আলী এ পর্যন্ত দিয়েছেন ১৫ বার, আর এদিন শাহরিয়ার সুলতানের পূর্ণ হলো পাঁচবার। কতই না মহৎ কাজ! বিনামূল্যে সিয়ামরত অবস্থায় রক্তদান করে মুমূষুর্ রোগীর পৃথিবীতে বসবাসে ভূমিকা রাখা। এটাই তো মানবতা।

এর আগে এরকমই এক ব্যক্তির উপকার পেয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান মানুষটির মুখে হাসি দেখতে পেয়েছিলাম। বছর তিনেক আগের ঘটনা। অমূল্য সম্পদ ‘মা’ হাসপাতালে ভর্তি। ছোটবোন তাবাসসুম পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরই চিকিৎসকের ঘোষণা, ‘জরুরী ভিত্তিতে এক ব্যাগ রক্ত লাগবে।’ মায়ের জন্য সন্তান হিসেবে প্রথমে নিজেই রক্ত দিতে রাজি হয়েছিলাম। তবে সেসময় শরীরের দিকে তাকিয়ে চিকিৎসক রাজি হননি, অন্য ডোনার নিয়ে আসতে বলেন। বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেও কিছুক্ষণ পর খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসেন অষ্টম শ্রেণী পড়ুয়া এক ছোট ভাই। তার স্বাস্থ্যও ছিল বেশ,ফলে এবার আপত্তি করেন নি চিকিৎসক। ক‘দিন পর সুস্থ হন মা। ফিরে যাই বাড়িতে, হাসি ফোটে পরিবারে। এটাই মানবতা!

এবারও দুই মানবতাবাদী পাশে দাঁড়িয়েছেন রক্ত দিয়ে। সাধারণ কোনো মানুষের জন্য নয়, একজন শিক্ষাগুরুর জন্য। শিশুকালে যাদের কাছে আমার শিক্ষার মশাল জ্বলেছে, তাঁদেরই একজন শিক্ষাগুরু অসুস্থ। মরণব্যাধী ক্যান্সার ছাড়াও মুখে ও দাঁতের সমস্যা ভুগছেন তিঁনি। ভর্তি হয়েছেন রাজশাহীর একটি বেসরকারী হাসপাতালে।রয়েছেন চিকিৎসাধীন। তবে প্রয়োজন ছিল অপারেশন। তাই দরকার চার ব্যাগ রক্ত। তাৎক্ষনিকভাবে জোগাড় হয়েছে দুই ব্যাগ। সেটি মো. আলমাছ আলী ও মো. শাহরিয়ার সুলতানের মানবিকতায়।

অত্যন্ত খুশি হয়েছেন প্রিয় শিক্ষক।ধন্যবাদ জানিয়েছেন রক্তদানে এগিয়ে আসা সন্তানতুল্য মানবতাবাদীদের।ওঁরাই মানবতাবাদী,ওঁরাই বিশ্ব মানবতার বন্ধু, দেশের গৌরব। দিনশেষে এটুকুই তৃপ্তির- মানবতাবাদীদের নিয়ে স্যারের পাশে থাকতে পেরেছি বিপদের সময়।

লেখক-সাংবাদিক ও কলামিস্ট, রাজশাহী।  

প্রিয় পাঠক আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর সরাসরি জানাতে ই-মেইল করুন নিম্নের ঠিকানায়  jamunaprotidin@gmail.com