যমুনা প্রতিদিন
ঢাকাসোমবার , ২৫ জুলাই ২০২২
  1. English
  2. অর্থ ও বাণিজ্য
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. খেলাধুলা
  6. গণমাধ্যম
  7. চাকরি
  8. ছবিঘর
  9. জাতীয়
  10. জেলার খবর
  11. তথ্যপ্রযুক্তি
  12. দেশজুড়ে
  13. ধর্ম
  14. নারী ও শিশু
  15. প্রবাসের কথা
আজকের সর্বশেষ সবখবর

‘সদা সত্য কথা বলিব’

আলাউদ্দিন আহমেদঃ
জুলাই ২৫, ২০২২ ১:৪৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

আলাউদ্দিন আহমেদঃ

সেদিন একটি জরিপ মূল্যায়ন চোখে পড়লো।যেখানে বলা হয়েছে; দেশের সত্তর ভাগ মানুষ এখন দুর্নীতিকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিয়েছে।অর্থাৎ মানুষের মনস্ত্মাত্তিক যে পরিবর্তন হচ্ছে তা নেতিবাচক। বিষয়টি সাধারন দৃষ্টিতে ভাবলেও তা ভয়াবহ তাতে কোন সন্দেহ নেই।

শিশুকালে আমরা পড়েছি;’সদা সত্য কথা বলিব’, ‘মিথ্যা বলা মহাপাপ’,’অন্যের হক নষ্ট করিব না’, ‘ওজনে বা পারিমাণে কম দিব না’,’কাউকে ঠকাব না’,গুরুজনকে ভক্তি করিব’-এ ধরনের অনেক মূল্যবান হিতোপদেশ আমরা পেয়েছি।

কিন্তু বাস্তবতা হলো এখন এই মূল্যবান উপদেশগুলো উল্টোদিকে চলছে।

এবারের বাজেটে আমরা প্রথমবারের মতো এক নজিরবিহীন ঘোষণা পেলাম।অর্থমন্ত্রী আহম মুস্ত্মফা কামাল বললেন;পাচার করা অর্থ ফেরত আনলে অপরাধ মাপ! এভাবে রাস্ট্রীয় পর্যায়ে অপরাধীকে শাস্তি না দিয়ে নির্দোষ সাব্যস্ত করলে কিভাবে দুর্নীতি কমবে-? বাস্তবে ওরা কি কেউ টাকা ফেরত আনবে-?

স্বাধীনতার পর তাজউদ্দীন আহমদের ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট এ বছর ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটিতে পৌঁছাল।এভাবে আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি হচ্ছে।বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সরকার অবকাঠামো উন্নয়নে সফলতার অনেক উদাহরণ তৈরি করেছেন এবং তা অব্যাহত আছে।আমরা অবশ্যই সাধুবাদ জানাই এই সফলতার জন্য।

আমরা দেখেছি স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়তে বঙ্গবন্ধু যখন হিমসিম খাচ্ছেন তখন রাতারাতি একটি রাজনৈতিক লুটেরা গোষ্ঠি সৃষ্টি হলো যারা তাঁর সকল কাজে বাধা সৃষ্টি করলো।তিনি সেই সময় অতিষ্ঠ হয়ে এদের বিরুদ্ধে অনেক বক্তব্য রেখেছেন।কিন্তু ‘চোরাই না শুনে ধর্মের কাহিনি’র মতই তাঁর আহ্বানকে ওই গোষ্ঠি আমলে নেয়নি।

সুদখোর, ঘুসখোর, লম্পট, চরিত্রহীন, চোর-ডাকাত-এ ধরনের চরিত্রের মানুষকে আগে সমাজ ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখতো।বয়স্কদের কাছে আমরা শুনেছি; পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে,এমনকি ষাটের দশকেও ঘুসখোর, চোর-ডাকাতের সামাজিক অনুষ্ঠানে মোলস্না-মৌলবি যেমন যেতেন না,তেমনই পঞ্চায়েত সরদার-মাতব্বররাও সেসব অনুষ্ঠান পরিহার করতেন।

কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে আমরা হঠাৎ করে দেখলাম-ব্রিফকেস-ব্যবসায়ী, ঘুসখোর চাকুরে, কমিশন বা দালালিখোর রাজনীতিকরা অনৈতিকতার আশ্রয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলেন।এখন তো অনেক অমুক্তিযোদ্ধাও সরকারি সুযোগ-সুবিধাসহ মৃত্যুর পর ‘গার্ড অব অনার’ পাচ্ছেন! এবং তারা সমাজেও বেশ দাপটের সাথে বিচরণ করছেন।প্রকৃতদের চাইতে তাদের মাথা এখন উঁচুতে।

অন্যদিকে বড় রাজনৈতিক দলগুলোতে মনোনয়ন বানিজ্য, কমিটিতে অন্ত্মর্ভুক্তির জন্য অর্থ গ্রহন, সামাজিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব নির্বাচনেও আর্থিক সুবিধা গ্রহন এখন ‘ওপেন-সিক্রেট’।সমাজে এমন অনেকেই আর্থিকভাবে হঠাৎ করে গতিশীল হওয়ার দৃশ্য বর্তমানে বড় শহর থেকে মাঠ পর্যায়ে পর্যন্ত্ম মানুষ প্রত্যয় করছে। এই অর্থ অর্জন করতে তেমন কোন যোগ্যতা লাগেনা। শুধুমাত্র আশির্বাদ এবং একটি চেয়ার হলেই তরতর করে ওঠা যায় অনেক উপরে।একবার পর্যাপ্ত অর্থের মালিক হতে পারলে আর পায় কে-? অনেকেই তখন সালাম দেয়, ঠ্যাকায়-বেঠ্যাকায় আর্থিক সাহায্য নেয়া যায়।অথবা সুবিধামত কিছু সামাজিক কাজে একটু দান-খয়রাত করলেই বেশ ভাল থাকা যায় সমাজে। এরপর নামের সাথে আলহাজ্ব লাগিয়ে নিতে পারলে (সবাই না) এবং একই সাথে বেশ-ভুসার কিছু পরিবর্তন করে নিলে বেশ সম্মানের সাথেই চলা যায়।

এই শ্রেনীর অসাধুরা ধর্মটাকেও ইচ্ছেমত ব্যবহার করে। ফলে এদের কাছে ‘সদা সত্য কথা বলিব’, ‘মিথ্যা বলা মহাপাপ’, ‘অন্যের হক নষ্ট করিব না’,অসৎ পথে উপার্জন করিব না’–এসব নীতিবাক্য উপহাসের সামিল।

এভাবে সমাজের সর্বস্তর থেকে মূল্যবোধের বিষয়গুলো হারিয়ে যাচ্ছে।অনৈতিকতার কাছে নীতি-আদর্শ পরাজিত হচ্ছে।কঠিন বাস্ত্মব হচ্ছে,আমরা সেই সমাজে বাস করি যেখানে সৎ মানুষকে বোকা ভাবা হয়।

রাজধানীর লেকশোর হোটেলে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন যৌথভাবে আয়োজিত এক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান আবারো আমলাতন্ত্রের ওপর বিরক্তি প্রকাশ করেছেন।সাবেক এ আমলা বলেছেন, আমলাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে আইনকানুন পরিবর্তন করা যাচ্ছে না ‘দুষ্টু আমলাদের চাতুরির’ কারণে।

তাঁর এই কথা প্রমান করে এক ধরনের অনৈতিকতার কাছে রাষ্ট্র নিজেই অসহায়! তাহলে সমাজ থেকে অনৈতিকতা-অপকর্মের বিরম্নদ্ধে চিরায়ত সেই বাণীগুলোর বাস্ত্মবায়ন আদৌ কি সম্ভব? সেইযে সুন্দর কথাগুলো; ‘সদা সত্য কথা বলিব’, ‘মিথ্যা বলা মহাপাপ’, ‘অন্যের হক নষ্ট করিব না’, অসৎ পথে উপার্জন করিব না’, গুরম্নজনকে ভক্তি করিব’।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে শিক্ষক নির্যাতনের ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আলাদা স্থানে ও সময়ে শিক্ষক নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও তা বিচ্ছিন্ন নয়। বরং সংলগ্নতা আছে।আমরা যে সাংস্কৃতিক ও নৈতিকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছি-এসব ঘটনা তারই লক্ষণ।

তিনি বলেন,শিক্ষার প্রতি আগে মানুষের আগ্রহ ছিল,সেই সূত্রে শিক্ষকদের সম্মান করা হতো।এখন তা কমে গেছে। কেননা এখন টাকা আর রাজনৈতিক জোরেই অনেক কিছু মিলে যাচ্ছে।যে কারণে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ কমে গেছে। এর সমান্ত্মরালে শিক্ষকদের প্রতিও আগ্রহ কমেছে। শিক্ষকদের প্রতি এ ধরনের আচরণ আগে ছিল অকল্পনীয়’।

এক সময়ের মূল্যবান উপদেশ; ‘লেখাপড়া করে যে গাড়ি-ঘোরা চড়ে সে’ এখন আর বলার প্রয়োজন নেই। এখন বলতে হবে; ‘একটি চেয়ার দাও, আশির্বাদ দাও, টাকা কামাও, গাড়িতে চড়ো, বাড়ি বানাও’।

আমি কথাগুলো কি হতাশা থেকে বলছি? মোটেই না। বরঞ্চ বাস্ত্মবতার একটি অংশ তুলে ধরার চেষ্টা করলাম মাত্র।এসব অপ্রয়োজনীয় লেখা পাঠ করে একজনের বিবেকেও যদি একটু দাগ কাটে তাহলেই মনে করবো এখনো কিছুটা হলেও অবশিষ্ট আছে; ‘সদা সত্য কথা বলিব’, ‘মিথ্যা বলা মহাপাপ’, ‘অন্যের হক নষ্ট করিব না’, অসৎ পথে উপার্জন করিব না’,গুরুজনেকে ভক্তি করিব’-এই অমোঘ নীতি বাক্যগুলো হৃদয়ে ধারণ করার মত বিবেকবোধ সম্পন্ন মানুষ আছে।আসলে এরা ঘুমিয়ে আছে,এদের জাগরণ দরকার।

(লেখকঃ গণমাধ্যমকর্মী)

প্রিয় পাঠক আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর সরাসরি জানাতে ই-মেইল করুন নিম্নের ঠিকানায়  jamunaprotidin@gmail.com