যমুনা প্রতিদিন
ঢাকাবুধবার , ৭ সেপ্টেম্বর ২০২২
  1. English
  2. অর্থ ও বাণিজ্য
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. খেলাধুলা
  6. গণমাধ্যম
  7. চাকরি
  8. ছবিঘর
  9. জাতীয়
  10. জেলার খবর
  11. তথ্যপ্রযুক্তি
  12. দেশজুড়ে
  13. ধর্ম
  14. নারী ও শিশু
  15. প্রবাসের কথা
আজকের সর্বশেষ সবখবর

শিক্ষক নয় হাতের বেতই শিক্ষাগুরু

মামুন বাবুলঃ
সেপ্টেম্বর ৭, ২০২২ ৮:২৫ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

মামুন বাবুলঃ

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্কুল কলেজে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা পাঠ্য বইয়ে মনোযোগ না দিয়ে ফেসবুক, হোয়্যাট’সঅ্যাপ,ইমু ও ইউটিউবে নানা গেমিং খেলায় আসক্ত হয়ে পড়েছে।অনলাইন ক্লাসের নামে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর হাতে স্মার্টফোন তুলে দিতে বাধ্য হয়েছেন অভিভাবকরা।এতে একদিকে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, অপরদিকে বই হতে দূরে সরেছে শিক্ষার্থীরা।পরিবার পরেছেন নানা বিপাকে, সময় মতো টাকা দিতে না পারলে সহ্য করতে হয় সন্তানের নানা মানসিক যন্ত্রণা। দিনের পর দিন তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আদর্শ শিক্ষা গ্রহণ না করে ভয়ংকর হয়ে উঠছে। শিক্ষকদের মান্য তো পরের কথা, জড়িয়ে পরছে নানা অপরাধমূলক অসামাজিক কাজে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নয়, হাতের ‘বেতই শিক্ষাগুরু’ হিসেবে শিক্ষা জাতির ‘মেরুদণ্ড’ সোজা করতে মুখ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে বিশ্বাস। শিক্ষকের হাতের ‘বেত’ তুলে নিয়েই আজ শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষার ত্রিমুখী দূরাবস্থায় পরিণত হয়েছে। জাতি সুদূর ভবিষ্যতেও আরোও অনেক কিছুই শিক্ষাখাতে দেখার অপেক্ষা মাত্র। একটু পিছনে ফিরে তাকালেই সবকিছুই পানির মতো স্বচ্ছ পরিস্কার হয়ে যাবে, তাতে আর বোঝার বাকি থাকবে না। পাড়াগাঁয়ের মক্তবে পড়ুয়া ছদ্মনাম আবদুল করিম গাজী। আগের অষ্টম শ্রেণি পাস। চাকরি পান স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে। নূন্যতম শিক্ষা হলে কি হবে! জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার কমতি নেই। এমনকি একজন আদর্শবান মিষ্টিভাষী শিক্ষকও। আচার-আচরণে অতুলনীয়। গাঁয়ের সবাই তাকে শ্রদ্ধা-ভক্তি করেন। হিন্দু-মুসলিমসহ ছোট বড় সকল বয়সের মানুষই তাকে সালাম দিতেন। শিক্ষক গুরুজি বলে কথা। হঠাৎ কাল বৈশাখী ঝর শুরু। স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফিরছিলেন। রাস্তায় যেতেই বজ্রপাতের বিকট শব্দে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। আশে-পাশের মানুষের সহযোগিতায় তাঁর নীজ বাড়িতে তাকে সবাই পৌছে দেন। অজোপাড়া গাঁ। হাসপাতাল প্রায় দশ থেকে বারো মাইল দূরে। যেতে হলে ট্রলার, নৌকা ছাড়া কোনো উপায় নেই। সড়কপথে যাতায়াতের তেমন ভালো ব্যবস্থাও নেই। কি করবেন ভাবতেই রাত হয়ে গেল! পরদিন সকালে নৌকায় তাকে জেলা সদর হাসপাতালে নেয়া হলো। ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বললেন- সরি স্যার…! প্রচন্ড শব্দে কানের শ্রবণপর্দার সমস্যা হয়েছে। এ সমস্যা দূর করতে অনেক টাকার প্রয়োজন পড়বে। আবার কান ভালো হবে কিনা তাও সন্দেহ আছে! আপনারা অন্য কোথাও বিকল্প ব্যবস্থা করে দেখতে পারেন। ডাক্তারের কথা শুনে স্যার তো নির্বাক! নূন্যতম বেতন পাই! এ বেতনে এমনিতেই সংসার চলে না। আবার এতো টাকা কোথায় পাবো? জমি-জমা চাষাবাদ করে বছরে যে ফসল পাওয়া যায়, তাতে খোরাকিই হয় না। তাছাড়া সন্তানের পড়াশোনার খরচ বহন করতে হয়! এ যেন মরার উপরে খরার ‘ঘা’ আর ‘নুন আনতে পানতা ফুরায়’ অবস্থা। সেদিন নিরুপায় হয়েই কিছু ঔষধ কিনে নিল। ঔষধ খাচ্ছেন। কিছুদিন পরে একটু সুস্থ। কিন্তু কানে তেমন শোনেন না। কিছুদিন পর কানে শোনার জন্য একটি মেশিন কিনে নিলেন। কি আর করার আছে; বিধি বাম! মেশিন কানে দিয়ে নিয়মিত স্কুলে যাওয়া-আসা করে এবং নিষ্ঠার সাথে দায়িত্বও পালন করে আসছেন। মেশিন ব্যবহার করার পরে কিছুটা শুনতে পেলেও, তেমন ভালো শুনতে পান না। এমনকি সে চশমা ছাড়া ভালো চোখেও দেখতে পাননি। ক্লাসে সব সময় বেত নিয়ে প্রবেশ করতেন। ছাত্র-ছাত্রীরা তাকে প্রচন্ড ভয়ও পেতো! পড়া বা কোনো রকম অন্যায় করলেই দিতেন কঠোর শাস্তি। পাঁচ-দশটি বেতের বারী। নতুবা কানে ধরে বিশ-পঞ্চাশবার ওঠবস করাতেন। কানে শোনেন না চোখেও তেমন দেখতেন না, তাই সবাই তাকে ‘বয়রা’ বা ‘কানাগাজী’ বলে ডাকতেন। দূরে বসে কানাফুঁসাও কম নয়। কাছে আসলে আবার সালামও দিতেন। শিক্ষার্থীরা দেখে ভয়ে রাস্তার পাশেই লুকিয়ে থাকতো। দেখলেই তো স্কুলে গেলে স্যার শাস্তি দিবেন। স্যারের শাস্তির ভয়তে ফাঁকি তো দূরের কথা, নিয়মিত পড়া শিখে শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসার চেষ্টা করতো। স্কুলে অন্যায় করলে শাস্তি তো দিতোই। বাবা-মাও কোনো কর্ণপাত করতো না। অন্যায় করছে তো শাস্তি। মাইরের পরে কোনো ঔষধ নেই বলে ভয়ও দেখাতো! মাঝেমধ্যে এট্টু-আট্টু দুষ্টমি করলেই মা-বাবাকে বিচার দিলে, উল্টো স্যারদের কাছে এসে মর্মভাষায় বলতেন, স্যার- মাংস আপনাদের হাড় ক’খান আমাদের! তাদের কি ভয়ানক আদেশ ছিলো! শিক্ষকদের প্রতি অঘাত ভক্তি শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধ ছিলো। বর্তমানে এ নিয়মের ব্যত্বয় ঘটছে। যাক, শিক্ষা অফিসার একদিন স্কুল পরিদর্শনে আসলেন। সবাই অফিসে, কিন্তু করিম স্যার ক্লাসে। তাকে অফিস কক্ষে ডাকা হলো। সে সাথে সাথেই বেত হাতে নিয়ে ক্লাস রুম হতে এসে হাজির। অফিসার হাতে বেত দেখে বললেন- আপনার হাতে এটা কি স্যার? এটা দিয়ে কি করেন? প্রতি উত্তরে ইতস্ততবোধে বললেন স্যার -এট্টু আট্টু তো শাস্তি দিতেই হয় স্যার! নয়লে ওরা তো ভয় পাবে না, মানুষের মতো মানুষও হবে না, দিনদিন বেয়াদব হবে আর অমানুষে পরিচয় দিবে স্যার! তাই মাঝেমধ্যেই সহনশীলভাবে এর ব্যবহার না হলে চলে স্যার! বেত’ই শিক্ষাগুরু! ক্লাসে বেত থাকলে শিক্ষার্থীরা ভয় পান, পড়া শিখে আসে, কোনো ধরনের অন্যায় করার সাহস পায় না স্যার। করিম স্যার একঘেয়ে, তাই বলেই যাচ্ছেন। তার কথা শুনে শিক্ষা অফিসার অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। আর কথাগুলো নিরবে শুনলো। কিন্তু করার কিছুই নেই। শিক্ষা নীতিমালা অনুযায়ী স্কুলে বেত রাখার অপরাধে প্রধান শিক্ষককে জরিমানা করলেন। বাংলাদেশে বর্তমানে শিক্ষক ও শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায় নাজুক অবস্থা। এর থেকে বেড়িয়ে আসার জন্য শিক্ষা নীতিমালা কিছুটা হলেও পরিবর্তন করা আবশ্যক। কেন শিক্ষার বর্তমানে এমন অবস্থা? শিক্ষার অভাব কোথায়? শিক্ষা নীতিমালা কি কেউ মানছে না, নাকি শিক্ষা বাণিজ্য চলছে? জনমনে গোলকধাঁধার মতো এমন প্রশ্নই ঘোরপ্যাঁচ খাচ্ছে! প্রশ্ন করলে ত্রি-সমস্যার সম্মুখীন হই। শিক্ষক হত্যা করছে শিক্ষার্থীকে! আবার শিক্ষার্থী হত্যা করছে শিক্ষককে! কেউ কেউ আবার প্রশ্নবিদ্ধ করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শিক্ষানীতিমালাকে! এর একমাত্র কারণ হলো কোনো মনিটরিং নেই, জবাবদিহিতা নেই, যে যার মতো করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো চালাচ্ছেন। “শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড” কাগজে কলমে আর মুখেমুখে কিন্তু বাস্তবতার বালাই নেই। মানসম্মত শিক্ষা অর্জন করতে হলে শিক্ষার্থীদেরক ‘সুশিক্ষায় শিক্ষিত’ করতে হবে। শিক্ষকদের যথাযথ দক্ষ অভিজ্ঞ করে গড়ে তুলতে হবে। মুষ্টিমেয় নয় সকল শিক্ষকদের যথাযথ ট্রেনিং এর আওতায় আনতে হবে। শিক্ষকদেরও শিক্ষার্থীদের সন্তানতুল্য দেখতে হবে। অভিভাবকদেরও আন্তরিক হতে হবে,শিক্ষকদের সম্মান করতে হবে। সন্তানের প্রতি নজর রাখা উচিত যে, তাদের সন্তান স্কুলে গিয়ে কি করছে? নাকি স্কুল ফাঁকি দিয়ে অন্য কোথাও কারো সাথে মিশছে, তা শিক্ষকদের সমন্বয়ে তদারকি করা এবং শাস্তি দেয়া। শিক্ষককে নয় সন্তানকে চাপে রাখলে শিক্ষার পরিবেশ আবার ফিরে পাবে বলে বিশ্বাস করছি। যে জাতি শিক্ষককে সম্মান দিতে জানে না সে জাতির শিক্ষার মেরুদণ্ড ভঙ্গুর অবস্থা।

যেমন একটি গাছের শিকড় কেটে দিলে ডাল ও পাতা এমনিই নিঃশ্চিহ্ন হয়ে যায়। যুদ্ধ করতে অস্ত্র লাগে তেমনি সুশিক্ষা পেতে হলেও দক্ষ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন শিক্ষককের প্রয়োজন আছে। যে জাতি যতই শিক্ষিত সে জাতি ততই উন্নত। আদর্শ শিক্ষার্থী গড়ে তুলতে হলে সুশিক্ষার কোনো বিকল্প নেই আর তাতে দেশও উন্নয়নের স্বর্নযুগে প্রবেশ করবে।

শিক্ষাঙ্গন ও শিক্ষামন্ত্রণালয়ে কানার হাটবাজার থাকলে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি হবে কিভাবে? এ জন্য প্রয়োজন যথেষ্ট মনিটরিং করা। তবে সুদূর ভবিষ্যতে “শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড” হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। শিক্ষাঙ্গন পুরোপুরি সন্ত্রাস ও দুর্নীতি মুক্ত রাখা জরুরি। এজন্যই চাই নীতি- নৈতিকতা আদর্শ ও সুশিক্ষা।

কাজেই দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীকে যেমন আদর্শশিক্ষা, নীতি-নৈতিকতা আচার- আচরণ শেখাতে ‘শিক্ষক নয়, হাতের বেতই শিক্ষাগুরু’ হিসেবে মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।তেমনি অতি রঞ্জিত শিক্ষকদেরও শিক্ষার্থীদেরকে নিজের সন্তান মনে করে ভালো আচার-আচরণ করা ও সহনশীল শাস্তি বিধানেই দায়িত্বশীল হওয়া উচিত।

লেখক – কবি ও শিক্ষক

প্রিয় পাঠক আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর সরাসরি জানাতে ই-মেইল করুন নিম্নের ঠিকানায়  jamunaprotidin@gmail.com